সিলেট প্রতিনিধি::
সিলেট নগরীর মেজরটিলা এলাকার জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতালকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের অপথ্যালমিক প্যারামেডিক্স সজল দেবের বিরুদ্ধে দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে রোগী দেখা, চিকিৎসা দেওয়া ও অস্ত্রোপচারে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ। একই সঙ্গে হাসপাতাল থেকে রোগীদের একটি বেসরকারি চক্ষু চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সজল দেব ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি অপথ্যালমিক প্যারামেডিক্স পদে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, রোগীর দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, প্রাথমিক স্ক্রিনিং ও চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেই রোগী দেখছেন। চোখের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি জটিল রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং অস্ত্রোপচারে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা জটিল রোগীদের একটি অংশকে সিলেট-তামাবিল সড়কের গ্রীণহিল এলাকায় অবস্থিত ‘শাহপরান (রহ.) চক্ষু সেবা কেন্দ্র’-এ যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে রোগীদের সেখানে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে রোগী পাঠানোর পেছনে কোনো আর্থিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ছাড়া প্রতি মাসে প্রায় তিন সপ্তাহ টিলাগড় এলাকার একটি চক্ষু চিকিৎসাকেন্দ্রে সজল দেব রোগী দেখেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তার চিকিৎসা কার্যক্রমের আইনগত অনুমোদন রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
সজল দেবের সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়েও স্থানীয় কয়েকজন প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, চাকরিতে যোগদানের কয়েক বছর পর তার জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। তবে তার মোট সম্পদের পরিমাণ, সম্পদের উৎস কিংবা এসব সম্পদ বৈধ আয় থেকে অর্জিত কি না—এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য আর্থিক নথি বা সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
এদিকে জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতালের ভেতরে থাকা সরকারি ওষুধের দোকান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী মনজু মিয়ার দাবি, নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও তাদের দোকানটি দেওয়া হয়নি। বরং সজল দেবের এক আত্মীয়কে দোকানটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছিলেন বলেও জানান।
তবে নিলাম প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সর্বোচ্চ দরদাতা কে ছিলেন এবং কী প্রক্রিয়ায় দোকানটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে—তা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সজল দেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি দাবি করেন, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে তাকে গণমাধ্যমে বক্তব্য না দেওয়ার জন্য নিষেধ করা হয়েছে।
তবে সিলেটের সিভিল সার্জন জানান, গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সজল দেবকে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সজল দেবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি অ্যাডহক কমিটি নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতাল পরিচালনা করছে বলেও জানান তিনি।
সিলেটের জেলা প্রশাসক বলেন, সজল দেব একজন সহকারী পর্যায়ের কর্মী। রোগী দেখা কিংবা প্রেসক্রিপশন লেখা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। ‘শাহপরান (রহ.) চক্ষু সেবা কেন্দ্র’টি সজল দেবের মালিকানাধীন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতালটির প্রশাসনিক কাঠামো, কর্মচারীদের দায়িত্বের সীমা, রোগী অন্যত্র পাঠানোর প্রক্রিয়া, ওষুধের দোকানের নিলাম এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক বা পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
Leave a Reply